দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পণ্য হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আয় করেছে। তবে প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পশুর চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখার খরচ এবং এ জন্য নেওয়া সরকারি ঋণ বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
গত ১২ অক্টোবর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রেকর্ড বছর
- পণ্য: ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টন
- কনটেইনার: ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউ
- গাড়ি: প্রায় ১২ হাজার ইউনিট
- জাহাজ আগমন: ৮১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ
- রাজস্ব আয়: ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; ব্যয় ৩২৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
প্রতিবেদনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আয় ৩৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ২৭৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
পশুর সচল রাখার খরচ
বন্দর কর্তৃপক্ষ কমিটিকে জানিয়েছে, মোংলার কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় বাধা পশুর নদের নাব্যতা ধরে রাখা, যার জন্য নিয়মিত ক্যাপিটাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং দরকার। ১ হাজার ৫৩৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার একটি ড্রেজিং প্রকল্প ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে; লক্ষ্য ৩৩১ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ। কাজটি করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। চলতি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ ২২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং হয়েছে, সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ৩.৪৮ শতাংশ।
২০৩০ থেকে শুরু ঋণ পরিশোধ
পশুরের সংরক্ষণ (রক্ষণাবেক্ষণ) ড্রেজিংয়ের জন্য ১ হাজার ৩৮৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অনুমোদিত হয়েছে। এর অর্থায়নে সরকার ৫ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদি ১ হাজার ২৪৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন করেছে। সুদসহ মোংলাকে মোট ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা শোধ করতে হবে। পরিশোধ শুরু ২০৩০ সালের মে মাসে, আর প্রথম কিস্তিই ১৯৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দায় বহু বছর বন্দরের ওপর চাপ হয়ে থাকবে।
পুরোনো নৌযান, আটকে থাকা প্রকল্প
বন্দর এখনও ১৯৪২ সালে নির্মিত অয়েল ট্যাংকার এমটি মেঘদূত, ১৯৬১ সালে নির্মিত তিনটি মুরিং বোট এবং দুটি পাইলট বোটের ওপর নির্ভর করছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) নির্মাণাধীন দুটি বেসরকারি কনটেইনার জেটির কাজ ৬২ শতাংশ শেষ হলেও আইনি জটিলতায় আটকে আছে। ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি-৩) একটি বড় প্রকল্পের জন্য কর্তৃপক্ষকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পদ্ধতি পরিবর্তন ও বিকল্প অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠাতে হয়েছে।
সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
বহরে দুটি শক্তিশালী টাগবোট যুক্ত হচ্ছে; বন্দর একটি বয়া-লেয়িং জাহাজ, একটি উদ্ধারকারী জাহাজ, একটি মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে ও গবেষণা জাহাজ কিনছে। বন্দর সম্প্রসারণ ও কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ডের জন্য চীনের সঙ্গে প্রায় ৩৪ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে; প্রতিবেদন অনুযায়ী চায়না এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ সুদে, পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড ও ২০ বছরে পরিশোধের শর্তে এ ঋণ দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনায় ২০২৭ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে মোংলাকে স্বয়ংক্রিয় ও পরিবেশবান্ধব “গ্রিন পোর্ট” হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এতে আছে জয়মনিরগোলে কনটেইনার টার্মিনালের দ্বিতীয় ধাপ, কার ইয়ার্ড ও বহুমুখী জেটি; এলপিজি, কয়লা, পচনশীল পণ্য ও রাসায়নিকের জন্য আলাদা জেটি; নদীশাসন; এবং হেলিপ্যাড ও হ্যাঙ্গারসহ একটি হেলিকপ্টার। বেশি কনটেইনার জাহাজ আকৃষ্ট করতে বন্দরের ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমও আধুনিক করা হচ্ছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে, ৫ নভেম্বর ২০২৬।




